Regd. No -S/2L/30631

Sundarban Project

সুন্দরবন
31st may 2020…
আয়লা এসে যেদিন দরজায় কড়া নেড়েছিলো সেদিন বুঝতে পেরেছিলাম ওদের আমাদের কে প্রয়োজন .. যাত্রা শুরু হয়েছিল সেদিন থেকে.. সেদিন ত্রাণ নিয়ে গিয়েছিলাম আমি, অনুপা, সোমা, নমিতা. মনে মনে খুব ভালো লেগেছিলো নতুন অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করতে যাচ্ছি ভেবে, মনে হয়েছিল আমরাও পারি…
অনেকবার যাওয়া ওদের সাথে অনেক সময় কাটানো, ওদের কাছে টানা… সবটা করতে করতে মনে হয়েছে শুধু একদিন, দুদিন বা একবছর না… ওদের তো আমাদের কে সব সময় দরকার…..শুরু হলো বার বার যাওয়া… দরকারে ছুটে যাওয়া, ওদের সমস্যা মেটানো বা ওদের সাথে সময় কাটানো…
না.. এটা কিছুতেই একার পক্ষ্যে সম্ভব না. আমরা একা কিছুই পারিনা. সবাই মিলেই সবার পাশে দাঁড়ানো যায় … অনেক নিয়ম নীতি অনুসরণ না করলে সঠিক ভাবে ওদের পাশে থাকা যাবেনা. গঠন হলো “TOUCH”(belgharia).তার পর থেকে আজ অবধি চলছে আমাদের কাজ… শুধু আয়লা বা অম্ফান না, আমরা সারা বছর নানা ভাবে কাজ করি “সুন্দরবন,” এর সাত টা গ্রাম নিয়ে. বই পত্র, জামা জুতো, খাবার, বস্ত্র, ওষুধ পত্র, ডাক্তার…. সমস্ত নিয়ে আমাদের সারা বছর প্রতি মাসে ছুটে যেতে হয়. কলকাতায় নিয়ে এসে চিকিৎসা করাতে হয়, মেয়েরা বড়ো হলে বাড়িতে রাখা সম্ভব নয় ওদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা করতে হয়, প্রতিবন্ধী বাচ্চা দের জন্য বিভিন্ন রকম সামগ্রী দিতে হয় যাতে ওরা আমাদের মতো করে বাঁচতে পারে..
মনে হয় আমরা যা খাই ওরাও খাবে, আমরা যা দেখি ওরাও সেটা দেখবে, আমরা যা পরি অন্তত ওরাও একবার পড়বে… তাই পুজোর সময় ওখানের সমস্ত বাচ্চা কে (প্রায় ছয় হাজার)আমরা পুজোতে নতুন জামাকাপড় দেই, ঠাকুর দেখতে নিয়ে আসি, বিভিন্ন শিক্ষা মূলক অনুষ্ঠান করি….
এতগুলো বছর ধরে আমরা এই কাজ করে চলেছি… থামিনি. না আর থামা সম্ভব না. ওদের যে সত্যিই প্রয়োজন আমাদের কে. এরকম আয়লা, অম্ফান, ঝড়, বৃষ্টি ওদের প্রতি মুহূর্তে আঘাত করবে… আবার, আবার, আবার ওরা শূন্য থেকে শুরু করবে, আবার ওরা নতুন করে স্বপ্ন দেখবে….আমাদের ডাক পড়বে… আর আমরা কিছুতেই নিজেদের সামলে রাখতে পারবোনা. দৌড়ে যেতে হবে ওদের কাছে…
ওদের থেকে শিখেছি স্বপ্ন বার বার দেখা যায়, ওরা শিখিয়েছে মরে গিয়েও বার বার বাঁচা যায়…
এখন আমরা আর চার জন নেই….
বিবেক দা, বীথি,পলাশ, শ্রাবনী দি, শান্তনিক, মৌসুমী, সৌরভ, সব্যসাচী, শীল দা, অমিতাভ দা, কৃষ্ণ দা, রাজীব, সায়ন্তিকা সবাই মিলে আমরা কাজ করি একদম নিজেদের মনের সমস্ত আবেগ, অনুভূতি দিয়ে… এটা যে পরম তৃপ্তি….বেশ কিছু মানুষ আড়াল থেকে “TOUCH” কে ছুঁয়ে আছেন. .. নাহলে আমরা এতটা এভাবে এগোতেই পারতাম না. তাদের মধ্যে যাদের নাম না নিলে সবটাই অপূর্ণ থাকবে তারা হলো সৃঞ্জয় দা, মুন্না দা, অভিষেক চক্রবর্তী. পূর্ণেন্দু রায়. আর অনেক অনেক মানুষ আজ আমার পাশে আছেন …. যারা না থাকলে আজকের এই কর্ম কান্ড কিছুতেই সফল হতো না…. আমরা সবার কাছে কৃতজ্ঞ যে সবাই আমাদের বিশ্বাস করে ভরসা করে আমাদের সাথে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন….

বীথি
#BELGHARIA_TOUCH

“বাড়িয়ে দাও তোমার হাত
আমি আবার তোমার আঙুল ধরতে চাই
বাড়িয়ে দাও তোমার হাত
আমি আবার তোমার পাশে হাঁটতে চাই
বাড়িয়ে দাও তোমার হাত”

– হাত বাড়ালেই বন্ধু হওয়া যায়? যায়, যদি সেই হাত অন্যজন শক্ত করে ধরে। হ্যাঁ, Belgharia TOUCH যদি তোমাদের হাত শক্ত করে ধরে তবে সেই প্রতিশ্রুতি তারা আপ্রান রক্ষা করার চেষ্টা করবে। এই সংস্থা শুধুমাত্র অন্যদের সন্তুষ্টিতে সীমাবদ্ধ থাকে না, নিজেদের ভালোলাগা আর ভালবাসার যথেষ্ট সম্মান দেয়। আমি তাদের একজন হাত – মেলানো বন্ধু। কিছুই পারিনা করতে, শুধু তাদের সাথে থাকার একটু চেষ্টা। এই সংস্থার কর্ণধার Sandipa Nandy দি যাকে আমি নিজের দিদির থেকে কোনো অংশে কম দেখতে পারিনা। আরো আছেন একজন বলিষ্ঠ মানুষ বিবেকদা! কি অসম্ভব মানসিক জোর তার, আর কি অমায়িক একটা হৃদয়। অক্লান্ত ভাবে এমন পরিশ্রম করে এক গাল হাসি মুখে রাখা যায়, সেটা না দেখলে বিশ্বাস করা সত্যিই মুশকিল। আমার বন্ধু Anupa Nandy Chakraborty, Soma Das
ওরা হলো এই পথ চলার প্রতিটি পদক্ষেপ। কি সযতনে একটি একটি পা রেখে এগিয়ে চলে তা কাছ থেকে না দেখলে অসম্ভব বোঝা! কাল সাথে ছিল আরো ক’ জন! Neel Photoartist, Palash দা, তোমরা যে পরিমাণ কঠোর পরিশ্রম কাল করেছো বা করো তার জন্য তোমাদের কাছে কৃতজ্ঞতারা ঋণী থাকবে।

উমফুন বা আমফান!! নতুন করে ওর সম্পর্কে বললে আমার মনে আরো ভীতি জন্মাবে। এতো তার গতি, এতো উদ্দাম, এতো উদ্ধত, এতটাই অবাধ্য ছিল যে মানুষকে তার ভিটে থেকে সরাতে এতটুকু কষ্ট হয় নি। প্রকৃতির এই তাণ্ডব আমরা সাধারণ মানুষ মুখ বুজে সহ্য করি এই ভেবেই যাতে আরেকটু অভব্যতা আমরা তার সাথে করতে পারি। হ্যাঁ, গতকাল গেছিলাম এই সংস্থার সাথে হেরোভাঙ্গা, ঝড়খালি ২নঃ, হিরন্ময় পুর, বাগানবাড়ী এই সকল অঞ্চল এর মানুষগুলোকে কিঞ্চিৎ সাহায্য করতে। সাহায্য কথাটা অনেক ছোট। কিন্তু এই মুহূর্তে এর বেশি বা কম কোনো শব্দই আমার মাথায় আসছে না। গত পরশুদিন গেছিলাম সন্দীপা দির বাড়ীতে। ওটা বাড়ী নাকি উদ্বাস্তুদের ঘর বোঝা দায়। এতো সংগ্রহ করা খাবার, জামাকাপড়, ওষুধপত্র…আমি দেখে থ! থরে থরে নিচ থেকে ওপর অব্দি ভর্তি। সব নিয়ে রওনা হলাম সকাল ৬টায়। রাস্তায় বৃষ্টি পেলাম। কিন্তু ওখানে পৌঁছে দেখি অসম্ভব রোদ আর তার সাথে গরম। অথচ মানুষগুলোকে দেখে আমি অবাক। সবাই মুখে মাস্ক পড়ে একহাত দূরত্বে সুন্দর করে লাইন ধরে বসে আমাদের প্রতীক্ষায়। ওখানকার মানুষের সহযোগিতা না পেলে এমন কাজ করা মুশকিল। ওরা খুব বাধ্য। অভাবী মুখগুলো দেখলে বুকে অনেক জোর আসে। আমরা কিছুতেই সন্তুষ্ট হইনা। আর ওরা? যৎসামান্য চাল, ডাল, তেল, চিড়ে, মুড়ি, বিস্কিট, সোয়াবিন, টুথপেস্ট, সাবান, মোমবাতি, দেয়াশলাই এই গুলো পাবে বলে কি সুখী সুখী মুখ করে বসে ছিল। এই মুখ দেখে বুকে জল আসবে না তো কি হবে? সাথে অবশ্যই একজন ডাক্তারবাবু (Anirban Ash, MBBS, MD)গেছিলেন স্বেচ্ছায় সাথে অনেক ওষুধপত্র নিয়ে। তিনি অতি ধৈর্য্য সহকারে একজন একজন মানুষকে কাছে ডেকে তার সমস্ত অসুবিধে শুনে যথাযথ ওষুধ দিলেন। কি ধৈর্য্য, কি ধৈর্য্য! উফ্! এতো গরমে, এতো যত্ন করে! এইজন্যই বলে ডাক্তার ঈশ্বরের সমান।

এবার একটু বলি কেনো আমরা অসহায় মানুষগুলোর পাশে? আসলে আমরা কিছু মানুষ, কিছু অন্য মানুষের পাশে থাকতে ভালোবাসি। কারণ একটা। একটাই প্রশান্তি কাজ করে। স্পর্শ যখন হৃদয় অব্দি পৌঁছে যায় তখন মানুষ নিজেকে আর নিজের গণ্ডির মধ্যে বেঁধে রাখতে পারেনা। ছুঁয়ে দিতে চায় অন্যদের। সেরকম হলে নিজের সবটুকু দিয়ে তাদের ভালো রাখতে চায়। আজ দিদি তার সকলকে নিয়ে যেভাবে দিনের পর দিন এই সহযোগীতা করে চলেছে, একমাত্র মানসিকতা যদি সেই ভাবেই প্রবল না হয় তবে এই কাজ করা অসম্ভব। খুব কম লোক এগিয়েও পিছিয়ে আসে শারীরিক অক্ষমতা এবং মানসিক অক্ষমতার জন্য। দিদি, তুমি পেরেছো। তুমি আমাদের পথ দেখাও, আমরা তোমার সাথে সর্বক্ষণ থাকবো।

Dr.Anirban Ash

সুন্দরবন নামটাই একদম ভুল। ৩১শে মে “বেলঘড়িয়া টাচ” এর উদ্যোগে একটা রিলিফ ক্যাম্প করতে গিয়ে ঠিক এটাই আমার মনে হলো।

সুন্দরটা কি আছে এখানে? না সুন্দরী গাছটা সুন্দর। নোংরা খাঁড়ি ঘেরা জলা জমি। আজ আয়লা কাল আম্ফান। বাড়ি নেই, জমি নেই, কারেন্ট নেই, ছাদ নেই, খাবার নেই, রাস্তা নেই, সরকারী সাহায্য নেই, ডাক্তার নেই, ওষুধ নেই, টিকটক নেই, ফেসবুক চ্যালেঞ্জ নেই, বাঁচবে কি মরবে তার ঠিক নেই। উল্টে পরিয়ায়ী শ্রমিক আছে, করোনার ভয় আছে, বাঘের গন্ধ আছে। তাহলে সুন্দরটা কি?

অনেক নেই তে আবার অনেক কিছু আছে।
যেমন ওদের অভিযোগ নেই, ওদের রাগ নেই
ওদের ভয় নেই
ওদের অভিমান নেই
ওদের সপ্ন নেই
ওদের জীবন নেই

এই নেই গুলো বাঁচিয়ে রাখতে ওদের একটা মন আছে।সেই মনটায় খুব যত্ন করে বাঁধ দিয়ে রাখা আছে, অনেকটা ভালোবাসা,অনেকটা কৃতজ্ঞতা,অনেকটা নীল আকাশ,অনেকটা মাটির গন্ধ, অনেকটা আন্তরিকতা আর অনেকটা শ্রদ্ধা।

আসলে ওরা খারাপ থাকতে থাকতে ওতেই অভ্যস্ত হয়ে গেছে।জন্ম থেকেই তাই ওরা জানেনা ভালো থাকা ঠিক কাকে বলে, রোজ দুবেলা খাবার কাকে বলে, ভালো জামা কাপড় কাকে বলে, দুপুরের গরমে পাখার হাওয়া কেমন হয়।তাই ওদের কোনো অভিযোগ নেই। তাই ভগবান নামক ভদ্রলোকের সাথে অভিমান করে আম্ফান কে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে তারা দিব্যি হাসছে।

আমরা প্রথমে গেলাম ঝড়খালি এলাকার একটা অঞ্চলে যেখানে বেশিরভাগ বিধবা মায়েরা এসেছিলেন যারা কোন সময়ে তাঁদের স্বামীকে বাঘের আক্রমনে বা নদীতে হারিয়েছেন। এরপর আমরা গেলাম ররঘুনাথপুরে যেখানে বেশিরভাগ মানুষ আদিবাসী এবং সমাজের সু্যোগ সুবিধা থেকে অনেক দুরে।আমরাও মানুষ তাঁরা ও মানুষ কিন্তু ভাগ্যের কি পার্থক্য। ডাক্তার হিসেবে এমন নির্বিবাদী রোগী পৃথিবীর কোথাও দেখিনি।

মেঠো রাস্তা খাঁড়ির ধারে হেলে পরা গাছে ঘেরা খড়ের চালের ভিতর ওই যে মানুষ গুলোর চেহারা,রোগা শরীর ঝামা রোদে পোড়া উস্কোখুস্কো চুল— ওদের মনের ভীতর টা সুন্দর।বৃষ্টির পরের আকাশের মতো পরিষ্কার। ওদের বাঁধ দেওয়া মনের ওই সৌন্দর্য আয়লা বা আম্ফান পালটাতে পারেনি। ঠিক সেই জন্য এত কিছুর পরও সুন্দরবন আজও এত সুন্দর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *